শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৬ পূর্বাহ্ন

 সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেছে ১৪টি প্রাণ,পরনে লাল শাড়ি-হাতে মেহেদি বিয়ের সাজেই শেষ যাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেকদক / ৭২ টাইম ভিউ
আপডেট সময়: শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

পরনে এখনো লাল শাড়ি। এই শাড়িতেই হয়েছে বিয়ে। হাতে মেহেদির টকটকে লাল দাগ। বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে বিষাদে। স্বজনদের কান্নায় ভারি রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বর। সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেছে ১৪টি প্রাণ। বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেওলাবুনিয়া এলাকার সাব্বির আর খুলনার কয়রার মার্জিয়া মিতু এদিন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি বাস ও বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারান দুই পরিবারের চার শিশু ও চার নারীসহ ১৩ জন এবং মাইক্রোবাসের চালক।”
রাত পৌনে ১০টার দিকে বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাফর আহমেদ মুঠোফোনে বলেন, মাইক্রোবাসটিতে চালকসহ ১৫ জন ছিলেন। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ১৪ জন মারা গেছেন। আর একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

জানা যায়, নিহতদের ৪ জন নারী, শিশু ও কিশোর ৫ জন এবং পুরুষ রয়েছে ৪ জন। নিহত সকলের বাড়ি মোংলা উপজেলার শ্যাওলা বুনিয়া এলাকায়। নিহতদের মধ্যে ১২ জনই মোংলা পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকসহ তার পরিবারের সদস্য। মাইক্রোবাসের ড্রাইভার মারা গেছেন।
নিহতরা হলেন, বর সাব্বির (৩০), নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতু (২৫), মিতুর নানী আনোয়ারা (৭০), দাদি রাশিদা বেগম (৭৫), বোন লামিয়া (১২), বরের বাবা আব্দুর রাজ্জাক (৭০), মা আঞ্জুমান বেগম (৬০), বরের ভাবি পুতুল (৩৫), আলিফ (১২), বরের বোন ঐশি (৩০), ঐশির স্বামী সামিউল, আব্দুল্লাহ সানি (১২), দেড় বছরের শিশু ইরাম ও মাইক্রোবাসের চালক নাঈম (৪০)।
কাটাখালী হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কে এম হাসানুজ্জামান বলেন, নৌবাহিনীর যাত্রীবাহী বাসটি খুলনার দিকে যাচ্ছিল। আর যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি ছিল মোংলা অভিমুখে। পথিমধ্যে বেলাইব্রিজ এলাকায় দু’টি যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।”
স্থানীয় ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মোংলা পোর্ট পৌরভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি আঃ রাজ্জাক তার ছোট ছেলে সাব্বিরকে বিয়ে দিয়ে কনে আনার জন্য বুধবার সকালে খুলনার কয়রা উপজেলায় অবস্থান করে। নববধূকে মাইক্রোবাসে নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার মোংলার দিকে আসছিল রাজ্জাকসহ তার পরিবারের সদস্যরা। বিকেলে মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে মোংলা থেকে ছেড়ে যাওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে (কয়রা থেকে মোংলার দিকে) আসা ওই মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে মুহূর্তের মধ্যে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন নিহত হয়। “নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে বিয়ের যাত্রীসহ মাইক্রোবাসটি মহাসড়কের রং সাইডে ছিল বলেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, দ্রুতগতিতে চলাচলের সময় দুইটি যানবাহনের মধ্যে সংঘর্ষ হলে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। আহতদের উদ্ধার করে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে দুর্ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কাটাখালী হাইওয়ে থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক এস আই মোঃ হাসান জানান, নিহতদের সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিলো। মাইক্রোবাসে বর পরিবারের ১১, কনে পরিবারের ৩ জন ও ড্রাইভারসহ ১৫ জন ছিল। নিহতদের মধ্যে রয়েছে মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকসহ বর পরিবারের ৯ জন, কনে পরিবারের ৩ জন ও ড্রাইভারসহ ১৩ জন। নিহতদের মধ্যে ৯ জনের মরদেহ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং বাকি ৪ জনের মরদেহ রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লে¬ক্সে রাখা হয়েছে। আহত আরও বেশ কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রামপালে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহত ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনই একই পরিবারের সদস্য এবং তারা সবাই মোংলা পৌর এলাকার ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বলে জানায় নিহত রাজ্জাকের স্বজনরা।”
বাগেরহাটের রামপাল থানা অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) সুব্রত মন্ডল জানান, ঘটনাস্থল থেকে ৪টি লাশ নেয়া হয় রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয় ১০ জনের লাশ। আর একজন গুরুতর আহত অবস্থায় খুলনা মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ঘটনায় সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে এসেছেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ স্থানীয় প্রশাসনের সকল কর্মকর্তারা।
নিহত কনে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) মামা আবু তাহের সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশায় আজ দুপুরে তাঁর ভাগ্নির (মার্জিয়া) বিয়ে হয়। মার্জিয়ার শ্বশুর বাড়ি মোংলার শেলাবুনিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয় বরযাত্রীদের মাইক্রোবাসটি। রামপালের কাছাকাছি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মার্জিয়া, তাঁর বোন লামিয়া, দাদি ও নানী মারা গেছেন।
মোংলা পৌর বিএনপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-আহŸায়ক খোরশেদ আলম মুঠোফোনে বলেন, ‘মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে সাব্বিরের বিয়ে হয়েছিল। তিনি ছেলে-পুত্রবধূ নিয়ে মোংলায় বাড়িতে আসছিলেন। পথে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আব্দুর রাজ্জাক, তাঁর ছেলে-পুত্রবধূ, মেয়েসহ ৮ জন মারা গেছেন। মাইক্রোবাসের চালকও নিহত হয়েছেন।
হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুকান্ত কুমার পাল বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত চারজনের মরদেহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। আহত কয়েক জনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মেহেনাজ মোশাররফ বলেন, সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত হাসপাতালে আটজনের মরদেহ এসেছে। এর মধ্যে তিনজন শিশু, তিনজন নারী আর দু’জন পুরুষ। আরেকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তিনিও মারা গেছেন।
বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেওয়ায় নিহতের বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে। এই ঘটনায় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এ রিপোর্ট রেখা পর্যন্ত পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার কাজ শেষ করে বর্তমানে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
অপর দিকে দুর্ঘটনার পর ওই এলাকা কর্ডন করে রাখে নৌবাহিনী। তবে দুর্ঘটনা কবলিত বাস দু’টিকে দ্রুত সরিয়ে ফেলায় মোংলা-খুলনা মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ জাফর আহমেদ বলেন, মোংলা-খুলনা মহাসড়কে বেপরোয়াভাবে সকল গাড়ি চলাচল করে। নৌবাহিনীর কয়েকটি বাসও চলে এ সড়কে। বিষয়টি নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বেশ কয়েকবার বলা হলেও আজ পর্যন্ত কোন ফল হয়নি। ফলে আজ (বৃহস্পতিবার) এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটলো।#sm


এই বিভাগের আরও খবর