রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ পূর্বাহ্ন

যশোর বিরামপুরে ৩৬০ বছর ঐতিয্যে দুর্গাপূজা আয়োজন

মালিকুজ্জামান কাকা,যশোর: / ৪২
আপডেট সময়: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬


শারদীয়া দুর্গোৎসবের মহালয়া শনিবার (১০ অক্টোবর)। দেবীপক্ষের সূচনায় যশোরের বিভিন্ন মন্দিরে চলছে শারদীয় দুর্গাপূজার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এই ধারায় যশোর শহরতলির বিরামপুরে জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যবাহী চণ্ডীমন্দিরে দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে। প্রায় ৩৬০ বছরের ঐতিহ্যের দাবিদার এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে জমিদারি আমলের ইতিহাস, দুর্গাপূজার স্মৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ক্ষয়ক্ষতি ইতিহাস।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, আগে বিরামপুর জমিদারবাড়িতে জাঁকজমক পরিবেশে দুর্গাপূজা হতো। জমিদার পরিবারের নিজস্ব অর্থায়নে পূজার আয়োজন, ঢাক-ঢোলের বাদ্য এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা অতিথির উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হতো। সময়ের পরিবর্তনে ঐ আয়োজনের পরিসর কমলেও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী উদ্যোগে দুর্গাপূজার ধারাবাহিকতা বজায় আছে ।
স্থানীয় প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, তৎকালীন রাজা কংসনারায়ণের বংশধর কলিকান্ত রায় ও বণিকান্ত রায় বর্তমান যশোরের বিরামপুর এলাকায় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের বংশধর কৃষ্ণ রামের পুত্র নিমানন্দ রায়, যিনি ভূষণার মুন্সেফ ছিলেন। জমিদারবাড়িতে চণ্ডীমন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন। দূরদূরান্ত থেকে দক্ষ কারিগর এনে কারুকার্যখচিত মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
মন্দিরটির প্রাচীনত্ব প্রায় ৩৬০ বছর এটি বিরামপুর এলাকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক হিসেবে পরিচিত।
জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর মন্দিরকেন্দ্রিক পারিবারিক পূজার আয়োজন সংকুচিত হয়ে আসে। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জমিদারবাড়ি ও চণ্ডীমন্দির ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় জমিদার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ও আত্মীয়স্বজন ভারতে চলে যায়। পরিবারের উত্তরসূরি বিমল রায় চৌধুরীর পরিবার বাংলাদেশে থেকে যায়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭২-৭৩ সালে বিমল রায় চৌধুরী ও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চণ্ডীমন্দিরে আবারও দুর্গাপূজা শুরু হয়। এরপর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে পূজার আয়োজন অব্যাহত।
জানা যায়, নিয়মিত পূজা-অর্চনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য বিমল রায় চৌধুরী জমিদারবাড়ির পারিবারিক দুর্গামন্দিরসহ মোট ছয়টি মন্দির দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দান করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবার যশোর শহরের বেজপাড়া এলাকায় স্থায়ী বসবাস শুরু করে।
এ বিষয়ে জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি অনুপ রায় জানান, তাঁদের পরিবার প্রতিবছর বিরামপুরে দুর্গাপূজার আয়োজনে অংশগ্রহণ ও সার্বিক সহযোগিতা করে।
অনুপ রায় জানান, কয়েক বছর আগে পুরোনো চণ্ডীমন্দিরটি ভেঙে নতুন মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। সামনে গ্রিল স্থাপন ও প্লাস্টারসহ কিছু কাজ বাকি। নতুন মন্দিরেই এবার দুর্গাপূজা হচ্ছে। এ সময় তিনি সবাইকে শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানান।
বর্তমানে স্থানীয় পূজা কমিটির উদ্যোগে প্রতিবছর বিরামপুর চণ্ডীমন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্‌যাপিত হয়। পুরোনো স্থাপনার পরিবর্তে নতুন মন্দির নির্মিত হলেও জমিদারবাড়ির দুর্গাপূজার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত।
মহালয়া কেন্দ্রিক দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরে। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি, মুক্তিযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং সময়ের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও বিরামপুরের চণ্ডীমন্দিরকে ঘিরে দুর্গাপূজার আয়োজন এলাকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বহন করছে।#


এই বিভাগের আরও খবর