সুন্দরবনে সক্রিয় চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ সদস্য র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনকে নিরাপদ ও জলদস্যুমুক্ত রাখতে র্যাব দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালসহ হাজার হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য সরাসরি এই বনের উপর নির্ভরশীল, তবে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে জলদস্যু ও বনদস্যুদের অপহরন, মুক্তিপন আদায় এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকান্ড বনজীবি ও স্থানীয়দের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান এবং সরকারের পুনর্বাসন উদ্যোগের ফলে পূর্ববর্তী সময়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন জলদস্যু ও বনদস্যু বাহিনীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য ইতিপূর্বে আত্মসমর্পণ করেছিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন দস্যুচক্রের তৎপরতা এবং পূর্বে আত্মসমর্পণকারী কয়েকজন দস্যুর পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে জেলে ও বনজীবীদের অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি এবং অন্যান্য অপরাধমূলক তৎপরতার ঘটনাও সামনে আসে।
এ প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলদস্যু ও বনদস্যুদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে র্যাব এর গোয়েন্দা নজরদারি ও আভিযানিক কার্যক্রম জোরদার করে। র্যাব-৬ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক তৎপরতা, বনের প্রতিকূল পরিবেশ এবং অপরাধমূলক জীবনের অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর সদস্যরা অপরাধের পথ পরিহার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এবং আত্মসমর্পণের আগ্রহ প্রকাশ করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সুন্দরবনে সক্রিয় ৪টি জলদস্যু বাহিনীর মোট ৫২ (বায়ান্ন) জন সদস্য র্যাব এর নিকট আত্মসমর্পণ করে।মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) র্যাব-৬ সদর দপ্তর, খুলনা থেকে পাঠানো এক প্রেস রিলিজে এ তথ্য জানানো হয়।
আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের বাহিনীভিত্তিক সংখ্যা নিম্নরূপ— বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী ১৬ জন, আনারুল বাহিনী ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনী ১৫ জন, আফতাব বাহিনী ০৮ জনসহ সর্বমোট ৫২ (বায়ান্ন) জন।
একযোগে চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ জন সদস্যের আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দস্যু বাহিনীগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা ও অপরাধমূলক তৎপরতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও অন্যান্য বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুদের অপতৎপরতা থেকে মুক্ত রাখা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা র্যাবের অন্যতম অগ্রাধিকার। সুন্দরবনে জলদস্যুতা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে র্যাব-৬ এর আভিযানিক কার্যক্রম ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
র্যাব-৬ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক যথাসময়ে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হবে।
উল্লেখ্য, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও বিচরণ নির্বিঘ্ন রাখা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। তিন মাসের এ নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে প্রযোজ্য বিধিবিধান ও অনুমতি সাপেক্ষে সুন্দরবন পুনরায় পর্যটক ও বনজীবীদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে।
সুন্দরবন পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার ঠিক আগের দিন চারটি জলদস্যু বাহিনীর ৫২ জন সদস্যের আত্মসমর্পণ বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ, পর্যটকদের নিরাপদ চলাচল এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনকেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকলে অবৈধভাবে কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারসহ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর অপরাধ প্রতিরোধেও তা সহায়ক হবে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা এবং দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে র্যাব সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ।