মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন

প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা নিশ্চিত হবে:মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: / ৪৩
আপডেট সময়: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা নিশ্চিত হবে:
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ।

সোমবার, (৩ আগস্ট) সকালে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান (Nature-based Solutions) উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা সুরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর ও টেকসই উপায় বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

সকালে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে অনুষ্ঠিত “Prioritizing Nature-based Interventions for Resilient Coastal Bangladesh” শীর্ষক জাতীয় কারিগরি কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। কর্মশালার আয়োজন করে ফ্রেন্ডশিপ ও কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনাল (CI)।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বন, জলাভূমি, উপকূলীয় উদ্ভিদবেষ্টনী এবং সমন্বিত কৃষি-বনায়ন ব্যবস্থা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখে না; এগুলো প্রাণিসম্পদের জন্য পশুখাদ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, প্রাণিস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যের সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হলেও দেশের উপকূলীয় অঞ্চল এখনো বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং উপকূলীয় ভাঙন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতি, খাদ্যব্যবস্থা এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এ দুটি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো পরিবার গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও হাঁস-মুরগির ওপর নির্ভরশীল। প্রাণিসম্পদ তাদের আয়, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্যোগের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও কাজ করে।

তিনি বলেন, টেকসই প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় উদ্যোগ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্যে ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান বলেন, ফ্রেন্ডশিপের মতো সংগঠন, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা হলো সরকারের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমকে সহায়তা ও শক্তিশালী করা। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে এসে সাহস, আশা এবং বাংলাদেশের জন্য একটি অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে সমন্বিত ভূদৃশ্যভিত্তিক (Landscape-based) কার্যক্রমের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ হিসেবে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানুষের জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাই উপকূলীয় সহনশীলতা নিশ্চিত করাকে তিনি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, পরিবেশ, পানি সম্পদসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি ফ্রেন্ডশিপ, কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, দেশের কৃষকদের স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আমাদের অন্যতম বড় সম্পদ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করেছেন, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে আরও কার্যকর, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে। এতে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা আরও নিরাপদ ও সমৃদ্ধ হবে।”

তিনি আরও বলেন, দেশের নেতৃত্ব সবসময় সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে এসেছে। জনমুখী নেতৃত্ব, সমন্বিত উদ্যোগ, স্থানীয় অভিজ্ঞতা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি জলবায়ু-সহনশীল, সমৃদ্ধ ও টেকসই উপকূলীয় বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।”

কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৌরভ মালহোত্রা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে খাপ খাইয়ে নিতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ এ প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি জলবায়ুজনিত ঝুঁকি হ্রাসের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান। অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান, বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।#


এই বিভাগের আরও খবর