সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০২:৫২ পূর্বাহ্ন

আমার বাবা,আমার আজীবনের আশ্রয়

মিজানুর রাকিব / ৯২ টাইম ভিউ
আপডেট সময়: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

বাবা দিবস এলেই হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা অসংখ্য স্মৃতি একে একে ভেসে ওঠে। আমার বাবা, মো. সোহরাব হোসেন, ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্য। একজন কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈনিক, একজন দায়িত্ববান অভিভাবক এবং একজন সৎ ও মানবিক মানুষ। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার স্মৃতি, শিক্ষা, ভালোবাসা এবং শাসন আমার জীবনের প্রতিটি মুহ‚র্তে জড়িয়ে আছে।
আশির দশকের কথা। আমি তখন যশোর ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে পড়ি। বাবা প্রতিদিন তার সাইকেলে করে আমাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। ছোট্ট আমি প্রায়ই সাইকেলের পিছনে বসে ঘুমিয়ে পড়তাম। বাবা তা বুঝতে পারতেন। এক হাত দিয়ে সাইকেল চালাতেন আর অন্য হাত দিয়ে আমাকে আগলে রাখতেন। বারবার ডাক দিতেন, “মিজান, তুমি কি ঘুমিয়ে পড়ছো?” আমি তখন বাবার সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরা শরীর দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরতাম, তার পোশাকের গন্ধ নিতাম। সেই গন্ধে ছিল নিরাপত্তা, ভালোবাসা আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আজও সেই স্মৃতি মনে পড়লে চোখ ভিজে আসে।
বাবা ছিলেন খুব রাগী মানুষ।”

আমরা পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে আমি সবচেয়ে বড়, আর সম্ভবত আমিই বাবাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম। এখনও কখনও স্বপ্নে বাবাকে দেখলে তার চোখের দিকে তাকাতে সাহস পাই না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, তার সেই কঠোরতার আড়ালে ছিল গভীর ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আর আমাদের মানুষ করে তোলার নিরন্তর চেষ্টা।
ছোটবেলায় একবার বাবার শাসনে অভিমান করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাড়ি থেকে পালিয়ে যাব। লঞ্চেও উঠে পড়েছিলাম। কিন্তু তখন আমার এক বছরের ছোট ভাই রোজাউলের মুখ মনে পড়ে গেল। তার মায়া আমাকে ফিরিয়ে এনেছিল। আজ মনে হয়, হয়তো বাবার ভালোবাসার টানও অজান্তে আমাকে ফিরিয়ে এনেছিল।
১৯৮৪ সালের একটি ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে। বাবা জরুরি কাজে ঢাকায় যাবেন। আমি জেদ ধরলাম, আমিও যাব। তখন আমি তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। বাগেরহাট শরণখোলার রায়েন্দা সদর থেকে ‘নাবিক’ নামের একটি দোতলা লঞ্চে করে বাবার সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সদরঘাটে নেমে জানতে পারলাম, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের কারণে হরতাল চলছে, কোনো যানবাহন নেই। আমাদের যেতে হবে মিরপুর ১১ নম্বরে, কাকার বাসায়।
আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাবা সাহস দিলেন। বললেন, “আমি তোমার মতো ছোটবেলায় অনেক হেঁটেছি, আমরাও হেঁটে যাব।” আমি বাবার হাত শক্ত করে ধরে হাঁটা শুরু করলাম। সকাল সাতটা থেকে বিকেল তিনটা, টানা নয় ঘণ্টা। সেই দীর্ঘ পথচলায় বাবার সঙ্গে কত গল্প, কত কথা, কত প্রশ্ন আর কত উত্তর! আজ মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে ম‚ল্যবান ভ্রমণ ছিল সেটি।
বাবা ছিলেন অত্যন্ত সৎ মানুষ। অসহায় ও গরিব মানুষের প্রতি তার ছিল অপরিসীম ভালোবাসা। মানুষের কষ্ট তিনি নিজের কষ্ট মনে করতেন। হয়তো তিনি সবসময় মুখে ভালোবাসা প্রকাশ করতেন না, কিন্তু তার প্রতিটি কাজেই ছিল পরিবারের প্রতি সীমাহীন মমতা।
২০১৯ সালে ঢাকা সিএমএইচে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে যান। দীর্ঘ অসুস্থতার সময় তার সেবা করার সুযোগ পেয়েছিলাম এটাকে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য মনে করি। বাবার শেষ মুহ‚র্তেও আমি তার পাশে ছিলাম। মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে আমার নাম ধরে ডাকছিলেন “মিজান… ও মিজান…। সেই ডাক আজও আমার কানে বাজে। সেই ডাক আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
আজ বাবা আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু এমন একটি দিনও যায় না, যেদিন তাকে মনে পড়ে না। তার জন্য বুকের ভেতর এক অদৃশ্য শ‚ন্যতা, এক গভীর কষ্ট বয়ে বেড়াই। আমি জানি, পৃথিবীর কোনো ভালোবাসা বাবার ভালোবাসার সমান নয়। তিনি ছিলেন আমার সাহস, আমার নিরাপত্তা, আমার জীবনের প্রথম নায়ক।
বাবা, আপনি যেখানে আছেন, আল্লাহ যেন আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন। আপনার শাসন, আপনার শিক্ষা, আপনার ভালোবাসা এবং আপনার ত্যাগ আমি সারাজীবন বয়ে বেড়াব। আপনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে, প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি প্রার্থনায় আপনি বেঁচে আছেন। বাবা, আপনাকে খুব মনে পড়ে। খুব ভালোবাসি।

বাবা দিবস নিয়ে লেখা “আমার বাবা, আমার আজীবনের আশ্রয়’’সাংবাদিক মিজানুর রাকিব


এই বিভাগের আরও খবর